মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকে হাওরে মাছের সংকট

|

নেত্রকোণা প্রতিনিধি

দেশের অন্যতম মৎস্য ভাণ্ডার হিসেবে খ্যাত নেত্রকোণার হাওরগুলোতে এ বছর পর্যাপ্ত ডিম না ফোটায় মাছের সংকট দেখা দিয়েছে বলে জানিয়েছেন মৎস্যজীবীরা।

স্থানীয় মৎস্য বিশেষজ্ঞরা জানান, নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিস্তীর্ণ হাওরগুলো মিঠা পানির মৎস্য ভাণ্ডার। এই হাওরগুলোতে বছরের ৭ /৮ মাস পানি থাকে। বৈশাখ মাসের শুরুর দিকে বৃষ্টিপাতে নেত্রকোণার হাওর গুলোতে নতুন পানি আসতে শুরু করে। নতুন পানি আসার সাথে সাথে রুই, কাতলা, বোয়াল, সিং, মাগুর, কৈ, গইন্যা, আইড়, সরপুঁটি, কাল বাউশ, চিংড়ি, শৌল, গজারসহ প্রায় ৫০ প্রজাতির দেশীয় মা মাছ হাওরে প্রচুর ডিম ছাড়ে। সেই ডিম থেকে কয়েক দিনের মধ্যেই রেণু পোনা ফোটতে শুরু করে। কিন্তু এবছর মাছের ডিম না ফোটায় আষাঢ় মাস শেষ হতে চললেও এই ভরা বর্ষাতেও মাছের পোণা কিংবা তেমন কোনো ছোট মাছ চোখে পড়ছে না স্থানীয় জেলেদের। তাই মৎস্যজীবীদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাজ পড়েছে। তারা হাওরাঞ্চলে মাছ সংকটের আশংকা করছে।

খালিয়াজুরী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোঃ মজিবুর রহমান জানান, হাওরে প্রায় ৫০ প্রজাতির দেশীয় মাছ রয়েছে। নতুন পানি আসার সাথে সাথে মা মাছেরা প্রচুর ডিম ছাড়ে। সেসব ডিম থেকে প্রায় ১০ মেট্রিক টন রেণু পোনা উৎপাদিত হয়। প্রতি বছর প্রায় ১২ হাজার মে. টন মাছ উৎপাদিত হয়। এখানকার উৎপাদিত মাছ স্থানীয় চাহিদা পূরণ করেও জাতীয় অর্থনীতিতে প্রায় ৩’শ কোটি টাকার অবদান রাখছে। এ উপজেলায় ৮ হাজার নিবন্ধনকৃত জেলে পরিবার ছাড়াও বর্ষাকালে মৎস্য আহরণ করে অন্তত ১৫ হাজার পরিবার সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে দিনাতিপাত করে।

তিনি আরো বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তো রয়েছেই, পাশাপাশি খালিয়াজুরী উপজেলার বিভিন্ন হাওরে অপরিকল্পিত ফসল রক্ষা বেড়ীবাঁধ নির্মাণের কারণে মৎস্য প্রজনন বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে।

খালিয়াজুরীর মৎস্যজীবী সুনীল বর্মন জানান, দুই বছর আগেও এই সময় হাওরে জাল টান দিলে ছোট সাইজের রুই, কাতলা, বোয়াল, কালবাউশ, গইন্যা ও আইড় মাছসহ নানা জাতের প্রচুর মাছ পেতাম। কিন্তু এবার হাওরে তেমন মাছ পাচ্ছিনা।

নেত্রকোণার হাওর উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ও খালিয়াজুরী প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক স্বাগত সরকার শুভ জানান, দুর্যোগ হাওরবাসীর পিছু ছাড়ছে না। গত বছর আগাম বন্যায় ফসল তলিয়ে যাওয়ায় উৎপাদিত ধান নষ্ট হয়ে পানি দূষিত হওয়ার পর মাছের মড়ক দেখা দিয়েছিল। এবার হাওরে মা মাছেরা পর্যাপ্ত ডিম ছাড়লেও রহস্যজনক কারণে মাছের পোনা ফোটে নাই। এক সময় এই হাওরে প্রায় ৬০ প্রজাতির দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। সঠিক পদক্ষেপের অভাবে ইতোমধ্যে অনেক প্রজাতির মাছ হারিয়ে গেছে।

কৃষিবিদ দীলিপ সেন জানান, নেত্রকোণার হাওরের জমিতে অতিরিক্ত মাত্রায় সার প্রয়োগের ফলে এধরণের ঘটনা ঘটছে। এ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হলে সরকারী উদ্যোগে মাছের পোনা ছাড়তে হবে। নয়তো হাওরে মাছের সংকট দেখা দেবে।

নেত্রকোণার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ রুহুল আমিন জানান, ফসল উৎপাদনে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ,পলি পড়ে প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো ক্রমশ ভরাট হয়ে যাওয়া,পর্যাপ্ত পরিমাণে মাছের অভয়াশ্রম না থাকা, জলমহালগুলোতে বিষ দিয়ে মাছ শিকার ও শুকিয়ে মাছ ধরার প্রবণতা ও মাছের উৎপাদনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে। তিনি আরো বলেন, হাওর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাদেরকে মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য করনীয় সম্পর্কে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।









Leave a reply