মিয়ানমার সীমান্তে আর একটি মৃত্যুও না

|

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত। ছবি-প্রতিকী

মোহসীন-উল হাকিম

তুমব্রু খালের পূর্ব পাশে মিয়ানমারের রাখাইন। এপাশে বান্দরবানের তুমব্রু। দুই পাশের নামই তুমব্রু। রাখাইন প্রান্তে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর রাইট ক্যাম্প। বিওপি হলেও এর পরিসর বেশ বড়। চারপাশে বাঙ্কার করা। প্রতিরক্ষার সব ব্যবস্থাই আছে সেখানে। শুধু তাই না, জনবলের দিক থেকেও বড়সড় তুমব্রুর এই বিওপি। মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) এই ক্যাম্পে কর্মরত দুই শতাধিক সীমান্তরক্ষী।

শুনেছি, সীমান্তরক্ষীর বেশে সেখানে জান্তা সরকারের সেনাবাহিনীও অবস্থান করে। বলা চলে, সামরিক প্রস্তুতি বেশ মজবুত। সীমান্ত রক্ষার চেয়ে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মিকে প্রতিহত করাই তাদের প্রধান কাজ।

গত কয়েক দিন ধরে এই রাইট ক্যাম্প ঘিরে সংঘর্ষ চলছে। সম্প্রতি দেশটির বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হামলায় পরাস্ত হয় বিজিপি। শতাধিক বিজিপি সদস্য পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। অসমর্থিত সূত্রে জানা যাচ্ছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিজিপি সদস্য নিহত হয়েছে আরাকান আর্মির হামলায়। সোমবার (৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরের দিকেও রাইট ক্যাম্পের সামনে তুমব্রু খালের পাশে ১৫-১৬টি মরদেহ মাটি চাপা দিতে দেখা গেছে বাংলাদেশের এপাশ থেকে। বিদ্রোহীরা নিহত বিজিপি সদস্যদের পা ধরে টেনে এনে মাটি চাপা দিচ্ছে।

মূলত, গত কয়েক বছর ধরে রাখাইন রাজ্যে বিজিপি ও দেশটির জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে বিদ্রোহী আরাকান আর্মি। আরাকান আর্মির আক্রমণে কোণঠাসা দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী। কিছু কিছু জায়গায় রোহিঙ্গাদের বিদ্রোহী সশস্ত্র সংগঠনও লড়াই করছে। তবে মূল যুদ্ধ চলছে আরাকান আর্মির সঙ্গে।

এই যুদ্ধ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। এ নিয়ে বাংলাদেশের কিছু বলার নেই। কিন্তু ওই দেশের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের প্রভাব কি মেনে নেব আমরা? যদি তাদের ছোড়া গুলি বা মর্টার শেলের আঘাতে বাংলাদেশের নাগরিকের মৃত্যু হয়, তবুও আমাদের কী কিছু করার নেই? দায়িত্বশীলরা সেটি ভালো বুঝবেন। কিন্তু সীমান্ত ঘেরা জনপদের মানুষের নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা তো দিতে হবে। সেই দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

সোমবার দুপুরের পর রাখাইন থেকে ছোড়া মর্টার শেল এসে পড়ে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমের জলপাইতলীতে হোসনে আরার বাড়ির রান্নাঘরে। সে সময় তিনি রান্নাঘরেই ছিলেন। মর্টার শেলের আঘাতে হোসনে আরার মৃত্যু হয়। সেখানে কাজ করতে আসা নবী হোসেন নামের একজন রোহিঙ্গাও মারা যান। ওই শেলের স্প্লিন্টারে আহত হয়েছে ছয় বছরের শিশু নুসরাত মনি। পায়ে আঘাত লাগে শিশুটির। ব্যাথা আর আতঙ্কে জর্জরিত শিশুটির দিকে তাকানো যায় না।

আহত নুসরাত।

মিয়ানমারে চলমান এই যুদ্ধে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের সীমান্ত ঘেঁষা অঞ্চল এখন আতঙ্কের জনপদ। মৃত্যুপুরী বললেও কম হবে না। অনেকদিন ধরে গোলাগুলি চলছে। যুদ্ধ চলছে কখনও দ্বিমুখী, কখনও ত্রিমুখী। এ অবস্থায় সীমান্তের অনেকে পরিবার নিয়ে সরে পড়েছেন নিরাপদ জায়গায়। তবে, যাদের সামর্থ্য ও উপায় আছে শুধু তারাই স্বজনদের নিয়ে চলে গেছেন নিরাপদ এলাকায়। যাদের সামর্থ্য ও সুযোগ নেই তারা থেকে গেছেন যার যার ঘরে। রাতে ঘুম নেই, বাক্স-পেটরা গুছিয়ে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে এমন সংখ্যাও কম না। তবে কোথাও যাওয়ার জো নেই, এমন সংখ্যা বেশি।

এদিকে, সীমান্ত রক্ষায় সতর্ক বিজিবি ও কোস্টগার্ড। প্রয়োজনে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর জনবল বাড়বে। প্রয়োজন হলে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীও বিজিবিকে সহযোগিতা করবে। কিন্তু এরমধ্যে যে সাধারণ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, তার দায় কে নেবে? এরইমধ্যে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। শিশুসহ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়েছে। যেভাবে গোলাগুলি চলছে, হেলিকপ্টার হামলা চলছে, তাতে আরও বড় দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে।

দায়িত্বশীলরা বলেন, যুদ্ধ মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমি বলি, ওপাশের গুলিতে বাংলাদেশের নাগরিকের মৃত্যু হলে তা কি শুধু তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকে? জানি বাংলাদেশ সংঘর্ষে জড়াবে না। সেটি দেশের নাগরিকরা চাইছেও না। কিন্তু ওপাশের মর্টার শেল বা গুলি থেকে বাংলাদেশের নাগরিকদের রক্ষা করতে হবে না? এখন পর্যন্ত স্থানীয় প্রশাসনের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত তুমব্রুর পাঁচটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা। শূন্যরেখার বাসিন্দাদের সরানোর কোনও ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বিপন্ন বাংলাদেশিদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেয়ার কোনও উদ্যোগও দেখছি না।

এতো নির্লিপ্ত আমরা থাকি কী করে বুঝি না। পাশের দেশের গুলিতে আমার দেশের মানুষের জীবন যাবে? ওদের সতর্ক করতে একটু মাইকিংও কী করা যায় না? আজ দুইজন মারা গেলো। ছয় বছরের শিশু নুসরাত মনির পায়ে স্প্লিন্টার লাগলো। আতঙ্কিত শিশুটির ব্যাথায় কাতরানো, আতঙ্কে বিবর্ণ হওয়া চেহারাটি একটু দেখবেন। আমরা যুদ্ধে জড়াবো না। তার মানে এই না যে দেশের নাগরিকদের জীবন বাঁচাবো না।

/এমএমএইচ


সম্পর্কিত আরও পড়ুন




Leave a reply