তত্ত্বাবধায়ক নয়, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায় ভারত- ঢাকা সফরে সুষমার বার্তা

|

মাহফুজ মিশু

সফর  ছিল ২৪ ঘন্টার। মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশ-ভারত যৌথ পরামর্শক কমিশনের সভায় যোগদান। ঢাকায় ব্যস্ত সময় কাটিয়ে গেছেন ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা  ছাড়াও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেছেন তিনি। এখন সবখানে আলোচনা, কী বার্তা নিয়ে এসেছিলেন সুষমা? বিশেষ করে  বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন নিয়ে প্রতিবেশির ভাবনা কেমন? এমন প্রশ্ন আরো জোরদার হয়েছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নিবাচনে ভারতের প্রত্যক্ষ সমর্থনের কারণে। সে সময়কার ভারতীয় পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং ঢাকায় এসে সেই নির্বাচনকে সমর্থন দিয়ে গিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলো ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি পুনরায় নির্বাচনও দাবি করেছিল। অনেকেই ধারণা করেন, সে সময় ভারত সরকারের আন্তরিকতা থাকায় নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা থাকলেও খুব একটা বেগ পেতে হয়নি ক্ষমতাসীন শেখ হাসিনা সরকারকে। এসব বাস্তবতায় সুষমা স্বরাজ নির্বাচন নিয়ে কী বললেন, সেদিকে সবার আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বৈঠকে সুষমা স্বরাজ যে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলে গেছেন, একাধিক সূত্র সেটি নিশ্চিত করেছে। আর বিএনপি চেয়ারপারসনের সাথে বৈঠকে উঠেছিল নির্বাচনকালীন সরকার প্রসঙ্গ। সেটির নাম ‘সহায়ক সরকার’ হোক আর যাই হোক না কেন। সুষমা স্বরাজ অবশ্য, এ ধরনের কোনো বিশেষায়িত সরকার বা নির্বাচনকালীন সরকার যে ভারত সমর্থন করে না, সেটি স্পষ্ট করেই জানিয়ে গেছেন বেগম জিয়াকে। বৈঠকে থাকা একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রী তাঁকে বলেছেন, এ ধরনের সরকার ব্যবস্থা সমর্থনের সুযোগ নেই। কারণ, ভারতে এ ধরনের ব্যবস্থা নেই। যে ব্যবস্থা আমরা নিজেরা অনুসরণ করি না, সেটি করার কথা কাউকে আমরা বলতে পারি না। তার মানে, নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার যে ভারত সমর্থন করছে না, সেই বার্তা স্পষ্টভাবেই দিয়ে গেছেন সুষমা স্বরাজ। তবে গত নির্বাচনের মত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে এবার আর ‘ব্ল্যাঙ্ক চেক’ নয়াদিল্লি দিচ্ছে না বলেই মনে করা হচ্ছে। সম্ভবত তার একটা বড় কারণ, ক্ষমতাসীন বিজেপি’র সাথে আওয়ামী লীগের মতাদর্শিক ভিন্নতা। গতবারও সেটি ছিল। কিন্তু গেলবার রাষ্ট্রপতি পদে ছিলেন প্রণব মূখার্জি। ভারতীয় একটি সূত্র বলছে, বাংলাদেশে নির্বাচিত বা অনির্বাচিত, সামরিক বা আধা সামরিক- সব সরকারের সময়ই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক ছিল। কাজেই সরকারে যারাই থাকুক, তাদের সাথে সম্পর্ক রাখবে ভারত।

গুঞ্জন আছে, চীনের প্রভাব কমানো ছিল সুষমার ঢাকা সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য। যদিও সেটি মানতে নারাজ দেশটি। তবে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গে সুষমা স্পষ্ট করে গেছেন দিল্লির অবস্থান। ২৫ আগস্টের পর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমার সফরে গিয়ে যে কথা বলেছিলেন আর ঢাকায় মাস খানেক পরে পররাষ্ট্র মন্ত্রী সুষমা স্বরাজ যা বললেন, তার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। প্রশ্ন উঠতে পারে, কারণ কী? বিভিন্ন সূত্রে কথা বলে জানা গেছে, শুরুর দিকে রোহিঙ্গা সংকটের এবারের ব্যাপকতা বুঝে উঠতে পারেনি নয়াদিল্লি। এখন এই ইস্যুতে তারা বাংলাদেশের পাশে আন্তরিকভাবেই থাকছে বলে দাবি করছে ভারতীয় সূত্রগুলো। তবে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারকে দৃশ্যমান চাপ হয়তো দেবে না ভারত। কিন্তু আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন যে দিল্লি চায়, সেটি স্পষ্ট। ভারতীয় সূত্রগুলোও জানিয়েছে, এবারের আলোচনায় তিস্তার পানিবন্টন চুক্তির বিষয়টা এসেছিল। দেশটির ব্যাখ্যা, তারা সব পক্ষকে সন্তুষ্ট করেই দীর্ঘমেয়াদী এ সমস্যার সমাধান করতে চায়। উদাহরণ হিসেবে কূটনৈতিক একটা সূত্র বলছে, স্থলসীমা ও সমুদ্র সীমা নির্ধারণ যেভাবে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে করেছে দিল্লি, তিস্তার পানি চুক্তিও ঐক্যমতের ভিতিত্তেই করতে চায় তারা। সেজন্য একটু সময় লাগছে বলে আবারো ঢাকাকে জানিয়ে গেছেন সুষমা স্বরাজ।

লেখক: কূটনৈতিক প্রতিবেদক, যমুনা টেলিভিশন

 









Leave a reply