প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন বিশ্বকাপে জৌলস ফেরালো বাংলাদেশ, স্বস্তিতে আইসিসি!

|

অবশেষে আইসিসি কর্তাদের মুখে দেঁতো হাসি। ম্যাড়মেড়ে সব একপেশে ম্যাচ দেখে লোকে যখন গালিগালাজ শুরু করছিল, তখনই ওভালে মাশরাফির বাংলাদেশ জমিয়ে দিল টুর্নামেন্ট।

বিশ্বকাপের প্রথম অঘটন যদি পাকিস্তানের ২০ ওভারে অল আউট হওয়া হয়, ওভালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জয় মুখ রাখল এশিয়ার। বাঘের গর্জন কি এ বার সত্যিই শুরু হল বিশ্বকাপে?

ওভালে জিততে না জিততে পরিচিত বাংলাদেশি সাংবাদিকের বার্তা ঢুকল ফোনে, ‘আরে আমরা এবার সেমিফাইনাল খেলব, মিলিয়ে নেবেন!’

বাংলাদেশ সেমিফাইনাল খেলবে কি না, সময় বলবে। তবে বিশ্বকাপের চার নম্বর দিনে বাঙালিই সুপারহিট।

ওভাল থাক, চলুন সাউদাম্পটনে। সকালে রোজ বোলের স্টেডিয়ামে অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড তুলতে যেতেই নিরাপত্তা কর্মীদের কাছে শুনতে হল, ‘রবিবার কেন এসেছেন? আজ তো ম্যাচ হওয়ার কথা নয়? কেউ প্র্যাক্টিস করবে বলেও খবর নেই! ওদেরও কেউ নেই।’

‘ওদের’ মানে? আইসিসি! এমনিতেই উইকএন্ডে এ দেশের লোক কাজ করে না, ওই দুটে দিন পুরোপুরি গা ছেড়ে দেওয়ার। তার উপর আগের রাতে গোটা দেশ চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে মজে ছিল। তা-ই বলে একেবারে খাঁ খাঁ করবে বিশ্বকাপের একটা ভেন্যুর মিডিয়া সেন্টার?

আজ্ঞে হ্যাঁ, করবে। কারণ অ্যাক্রিডিটেশন তোলার যে সব শর্ত বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ামক সংস্থা আইসিসি-র পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে, তাতে পরিষ্কার লেখা আছে, ম্যাচ বা তার আগের দিন ছাড়া অ্যাক্রিডিটেশন তুলতে হলে সরকারি ছুটির দিন বাদ দিয়ে আসতে হবে।

অগত্যা হাতে রইল হতাশা। মিডিয়া সেন্টার অবশ্য খোলা, ঝাঁ চকচকে সাজানো। টিভিতে তখন ওভালের বাংলাদেশ-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচ চলছে। ল্যাপটপ খুলে কাজ করতে চাইলে অসুবিধে নেই। কিন্তু আইসিসি-র কারও খোঁজ করলে ‘তোমার দেখা নাই রে!’

অগত্যা হাঁ করে ছবির মতো মাঠটার দিকে তাকিয়ে থাকা। বিশ্বকাপের নানা রকমের হোর্ডিং দিয়ে সাজানো, প্রস্তুতিতে কোনও ফাঁক নেই। পাঁচ তারা হিল্টন হোটেলের লাগোয়া স্টেডিয়াম, মূল শহরের কেন্দ্র থেকে বাসে প্রায় মিনিট চল্লিশের রাস্তা। শেন ওয়ার্নের অসম্ভব প্রিয় হ্যাম্পশায়ার কাউন্টির এই মাঠেই আগামী বুধবার বিরাটদের বিশ্বকাপ অভিযান।

এই বিশ্বকাপ আসলে আইসিসি-র বড় পরীক্ষা। কীসের পরীক্ষা? ক্রিকেটের আঁতুরঘরে ওয়ান ডে ফর্ম্যাটকে টিকিয়ে রাখার। এই বিশ্বকাপ ঠিক করে দেবে, পঞ্চাশ ওভারের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ। বহু সাইক্লোনের তাণ্ডব সহ্য করেও ১৪২ বছর টিকে গিয়েছে ক্রিকেটের সর্বোত্তম ফর্ম্যাট পাঁচ দিনের টেস্ট ক্রিকেট। শুধু টিকেই যায়নি, এই বিশ্বকাপ শেষ হলেই শুরু হবে টেস্ট ক্রিকেটের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপও। যেখানে হোম অ্যান্ড অ্যাওয়ে প্রথায় পয়েন্ট সিস্টেমে ঠিক হবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন।

পাশাপাশি সাপের ফণা তুলেছে কুড়ি-বিশ। আইপিএল শুরু হওয়ার বারো বছরের মধ্যে সেটাই পৃথিবীর জনপ্রিয়তম লিগ, দেশে দেশে ছড়ি ঘোরানো শুরু করেছে কুড়ি-বিশের লিগগুলো। এই পরিস্থিতিতে ফর্ম্যাট বদলে ৪৫ দিনের কাপ কি বাঁচিয়ে দেবে ৫০ ওভারের ফর্ম্যাটকে? বড় প্রশ্নচিহ্ন।

২০১৫ সালের ১৪ টিম থেকে এ বার ১০ টিম করাই হয়েছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও মারকাটারি করতে। যাতে লটারিতে ভালো ড্র পেয়ে কেউ না ফাঁকতালে সেমিফাইনালে চলে যায়। বলা হয়েছিল, প্রতিটা ম্যাচ হবে হাড্ডাহাড্ডি। কোথায় কী, তার বদলে শুরুতেই একপেশে আর ম্যাড়মেড়ে সব ম্যাচ।

বিশ্বকাপ শুরু হয়ে গিয়েছে প্রায় চার দিন, এখনও পর্যন্ত থিম হতে পারে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীনতা।’ ইংল্যান্ডের কাছে দক্ষিণ আফ্রিকা দাঁড়াতে পারেনি, ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে পাকিস্তানের লজ্জাজনক আত্মসমর্পণ। ৩৪ ওভারে শেষ হয়ে গিয়েছে একটা ১০০ ওভারের ম্যাচ! কল্পনাতীত, কারণ ওই পাকিস্তানই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সিরিজে ক’দিন আগেই রোজ ৩০০ প্লাস করেছে।

একই ভাবে শ্রীলঙ্কা উড়ে গিয়েছে নিউ জিল্যান্ডের কাছে, আফগানিস্তান ধসে গিয়েছে অস্ট্রেলিয়ার সামনে। বাংলাদেশ ওভালে জিতে টুর্নামেন্ট জমালেও পরিষ্কার কথা, আইসিসি চাতক পাখির মতো তাকিয়ে ভারতের দিকে। ২০০৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্বকাপে প্রথম রাউন্ডে ভারত ছিটকে যাওয়ার পরে সোনার হাঁসকে বাঁচাতে কম চর্চা করেনি আইসিসি।

নির্যাস একটাই। ভারত যখন খেলাটার ক্ষেত্রে ‘লাগে টাকা, দেবে গৌরী সেন’ তখন তার দাদাগিরি সহ্য করে নেওয়াই ভালো। সেই অঙ্কেই এ বারও ভারতই বাজি টুনার্মেন্ট সুপারহিট করাতে। যত ভারত এগোবে, তত আইসিসি-র কর্তাদের মুখের হাসি চওড়া হবে। তত ভরবে কোষাগার।

কিন্তু এর বাইরে? যে কোনও বিশ্বকাপ সুপারহিট হতে গেলে লাগে তারকা। যিনি সব অঙ্ক বদলে হয়ে উঠবেন গেমচেঞ্জার। সেই পর্যায়ের তারকা এখন বিশ্ব ক্রিকেটে হাতে গোনা। বিরাট কোহলি, স্টিভ স্মিথ, বেন স্টোকস, ডেভিড ওয়ার্নার—আর নাম কোথায়? ক্রিস গেইল কতটা টানতে পারবেন সন্দেহ, একই প্রশ্ন আন্দ্রে রাসেল সম্পর্কেও। সেখানে নতুন মুখ বাঁচাতে পারে বিশ্বকাপকে। যেমন হার্দিক পাণ্ডিয়া বা জশপ্রীত বুমরা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের নিকোলাস পুরান, অস্ট্রেলিয়ার মার্কাস স্টোইনিস বা অ্যাডাম জাম্পা, দক্ষিণ আফ্রিকার কাগিসো রাবাডা।

সম্ভাব্য তারকা ঠিক আছে, কিন্তু তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা দিচ্ছে ইংল্যান্ড। একবারও ওয়ান ডে বিশ্বকাপ জিততে না পারা ইংল্যান্ড। ফেভারিটের তকমা কাঁধে, ইওন মর্গ্যানের টিম কাপ জিতলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো জো রুট বা বেন স্টোকস হতে চাইতেও পারে। এই বিশ্বকাপ ইংল্যান্ডের কাছে ক্রিকেটকে বাঁচিয়ে রাখার কাপ।

নয়তো? সবাই এ দেশে যথারীতি ডেভিড বেকহ্যাম বা হ্যারি কেনই হতে চাইবে!


লেখাটি টাইমস অব ইন্ডিয়ার বাংলা ভার্সনে প্রথম প্রকাশিত।









Leave a reply