প্রেমিকার চার বছর কারাবরণের পরে হাজির ‘গুম’ হওয়া প্রেমিক

|

প্রেমের বিরোধকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় মিথ্যা অপহরণ ও গুমের মামলায় প্রেমিকাসহ তার পরিবারের ছয়জনকে জেল খাটানোর মাধ্যমে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে প্রেমিকের পরিবারের বিরুদ্ধে।

তবে দীর্ঘ পাঁচ বছর আত্মগোপনে থাকা প্রেমিক আদালতে স্বশরীরে হাজির হলে মিথ্যা মামলার বিষয়টি প্রকাশ পায়। একইসাথে এই মামলায় থানা পুলিশের বিরুদ্ধে গুম খুনের দায় স্বীকার করিয়ে জোরপূর্বক এক নারীর মিথ্যা জবানবন্দি আদায়ের অভিযোগ তুলেছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী।

২০১৪ সালে চাঁদপুর জেলার মতলব থানার শাখারীপাড়া গ্রামের আবুল কালামের ছেলে নবম শ্রেণির ছাত্র মামুনের সাথে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে একই এলাকার রকমত আলীর মেয়ে তাসলিমা খাতুনের সাথে। তবে দুই পরিবারের অভিভাবকরা এই সম্পর্ক মেনে না নেয়ায় তাসলিমাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম লামাপাড়া এলাকায় তার খালা আমেনা বেগমের বাড়িতে।

খালার বাড়িতে থেকে তাসলিমা সেখানকার একটি গার্মেন্টস কারখানায় চাকরি নিলেও মামুনের সাথে মোবাইল ফোনে তার যোগাযোগ চলতো। সে বছর ১০ মে সকালে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তির ফোন পাওয়ার পর মামুন নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে যায়। এরপর থেকে মামুন নিখোঁজ হয় এবং তার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকে।

এমন অভিযোগ এনে ঘটনার দুই বছর পর ২০১৬ সালের ৯ মে মামুনের বাবা আবুল কালাম ছেলেকে অপহরণ ও হত্যার উদ্দেশ্যে গুমের অভিযোগে ফতুল্লা থানায় ৩৬৪ ধারায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় আসামি করা হয় মামুনের প্রেমিকা তাসলিমা, তার বাবা রকমত আলী, বড় ভাই রফিক, মামা ছাত্তার মোল্লা এবং দুই খালাতো ভাই সাগর ও সোহেলকে।

পরে পুলিশ ছয়জনকে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়। মামলায় এই ছয় আসামি বিভিন্ন মেয়াদে কারাভোগ করে জামিনে মুক্ত হয়।

এরপর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তৎকালীন ফতুল্লা থানার উপ-পরিদর্শক মিজানুর রহমান মামুনকে হত্যা ও গুমের দোষ স্বীকার করার জন্য ২০১৬ সালের ১০মে এবং ১৪মে আসামি ছাত্তার মোল্লা, সাগর ও সোহেলকে পর্যায়ক্রমে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদানের জন্য প্রেরণ করে।

এসময় তদন্ত প্রতিবেদনে পুলিশ দাবি করে, আসামি সোহেল অন্যান্য আসামিদের সাথে মিলে মামুনকে হত্যা করে শীতলক্ষ্যায় লাশ ভাসিয়ে দিয়েছে বলে ১৬১ ধারায় স্বীকার করেছে।

পুলিশ এই স্বীকারোক্তি ১৬৪ ধারায় রেকর্ড করার আবেদন করে তিন আসামিকে আদালতে পাঠালেও তাদের সবাই পুলিশের নির্দেশনা মতে মিথ্যা জবানবন্দি দেন। পরে এই মামলায় পুলিশ তাসলিমার মামি মাকসুদার কাছ থেকে হত্যাকান্ডের স্বাক্ষী হিসেবে ১৬৪ ধারায় একই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করে একটি প্রতিবেদন দিয়ে তদন্তের জন্য ডিবি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।

পরে মামলাটি আবারো হস্তান্তর করা হয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডিতে। সেখানে তিন তদন্ত কর্মকর্তার হাত ঘুরে উপ-পরিদর্শক জিয়াউদ্দিন উজ্জ্বল তদন্তভার পান। তিনি ২০১৯ সালে ১৮ ডিসেম্বর ৩৬৫/৩৪ ধারা মোতাবেক আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। সিআইডির এই চার্জশিটে আসামিদের বিরুদ্ধে অপহরণ ও গুমের অভিযোগ প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হলেও হত্যার বিষয়ে নিশ্চিত করা হয়নি। মামুনকে গুম বলেই উল্লেখ করা হয়।

এদিকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর বুধবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আফতাবুজ্জামানের আাদলতে মামলার বিচার প্রক্রিয়ার ধার্য্য তারিখে আসামিরা আদালতে হাজির হন। একই সময়ে কাকতালীয়ভাবে দীর্ঘ ছয় বছর পর মামুনও হাজির হয় আদালতে।

এসময় দুইপক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও তুমুল বাকবিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। আসামিদের দাবি, তাদেরকে মিথ্যা অপহরণ মামলায় ফাঁসিয়ে চার বছর যাবত হয়রানি করা হচ্ছে।

তবে মামুনের দাবি, তাকে কেউ অপহরণ করেনি। বাবা মায়ের উপর অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়ে গাজীপুরে বসবাস করছিলো সে।

এদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী এমদাদ হোসেন সোহেলের অভিযোগ, পুলিশের তদন্ত সঠিকভাবে না করায় বিনা দোষে আসামিরা কারাভোগ করেছে। তিনি এ ঘটনায় জড়িতদের শাস্তি ও আসামিদের ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।

নারায়ণগঞ্জ সিআইডি বিশেষ পুলিশ সুপার নাছির উদ্দিন আহমেদ এ ঘটনায় ফতুল্লা থানা পুলিশকে দায়ী করেন। তার দাবি, পুলিশের পাঠানো জবানবন্দির উপর ভিত্তি করেই সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা চার্জশিট দিয়েছে। তবে সিআইডির তদন্তে কারো গাফিলতি থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিতসহ ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানান তিনি।

সিআইডির এই কর্মকর্তা আরো দাবি করেন, পরিবারের যোগসাজশেই পুলিশের কাছে তথ্য গোপন করে মামুনকে আত্মগোপনে রাখা হয়েছিল।


সম্পর্কিত আরও পড়ুন




Leave a reply