কী আশায় বাঁধি নতুন কেতন

|

ছবি: এএফপি

মুরশিদুজ্জামান হিমু

বন্ধু হও, শত্রু হও, যেখানে যে কেহ রও

ক্ষমা করো আজিকার মতো

পুরাতন বরষের সাথে

পুরাতন অপরাধ যত

নতুন বছর নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবনা ছিল এমনই। পুরাতনকে ঝেড়ে ফেলে নতুন বরণে তিনি ছিলেন উদারমনা। সদা অকৃপণ।

আমাদের সামনেও নতুনকে বরণের উপলক্ষ্য। নতুন ইংরেজি বছর; নতুন ক্যালেন্ডার। কাগজে-কলমে অনেক কিছুই হচ্ছে নতুনের মোড়কে। কিন্তু আদতে কতটা পাল্টাচ্ছে সাধারণ মানুষের নিয়তি। নাকি পুরাতন বছরের জের টানতে টানতে চলে আসবে আরেকটি বছর বরণের সময়?

খুব বেশি গভীরে যাওয়ার দরকার নেই। রাজনীতির মাঠের সমীকরণ টানলেই সহজ হয়ে যায় অনেক কিছু। সমীকরণ টানা যাবে ঠিকই, হিসেব মিলবে না কিছুতেই। কথায় বলা ‘যেই লাউ সেই কদু’ টাইপ। কত আশা-ভরসা নিয়ে আমরা তাকিয়ে থাকি কিছু মানুষের দিকে। কিন্তু দিনশেষে সংঘাত-সহিংসতা, বাসে আগুন, ট্রেনে আগুন, পুড়িয়ে মানুষ হত্যা দিয়ে শেষ হয় যাপিত বছর।

অথচ এই আগুনে কি আমরা জ্বলতে চেয়েছিলাম? আমরা চেয়েছিলাম, আমাদের রাজনীতি এমনভাবে জ্বলে উঠুক, যাতে পুড়ে ছারখার হবে সব অনিশ্চয়তা-অমানিশা। রাজনীতির উত্তাপ পুড়িয়ে দেবে দেশ নিয়ে সব দুরভিসন্ধি। কিন্তু জ্বলার কথা কী, আর জ্বলছে কী! এ যেন অজানা জল আর জানা শ্মশান!

আমরা চেয়েছিলাম একটা শক্ত অর্থনীতি। যে অর্থনীতি মানুষকে দেবে শক্তি। দেবে স্বাধীনভাবে বাঁচার ক্ষমতা। যখনই একটু একটু করে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে গেলাম, তখনই কী থেকে যেন কী হয়ে গেল। যুদ্ধ শুরু হল, আমরা হলাম টালমাটাল। হু হু করে বিশ্বজুড়ে বাড়তে থাকল পণ্যের দাম। আর গরীব দেশগুলোতে বাড়তে থাকল অভাব। এখনও সেই যুদ্ধের দামামা বেজেই চলছে। বোমা কিয়েভে নাকি খেরসনে পড়ছে, গাজায় নাকি রামাল্লায় পড়ছে, সেটি বিষয় নয়। বোমা পক্ষান্তরে পড়ছে উঠতি অর্থনীতির দেশের খেটে খাওয়া মানুষের পেটে।

আমরা চেয়েছিলাম, চালের কেজি হবে কম। সবজি পাব কম দামে। পেঁয়াজের দরও আকাশচুম্বি হবে না। তেলও নাগালেই থাকবে। কিন্তু প্রায় সবকিছুর দর এতবেশি উপরে উঠেছে, মাঝে মাঝে মনে হয় যেন ছাদ ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করবে।

আমরা চেয়েছিলাম, আমাদের রাস্তা নিরাপদ হোক। কোনো ফিটনেসবিহীন যান এই দেশের রাস্তায় না চলুক। বাসচাপায় কেউ প্রাণ না হারাক। কিন্তু এখনও মানুষের মুখে মুখে ফেরে– ‘নিরাপদ সড়ক চাই’।

আমরা চেয়েছিলাম, সিন্ডিকেটের আধিপত্য কমুক। কমুক ঘুষবাণিজ্য। বন্ধ হোক শিশু-নারী নির্যাতন। শহরে মশা নয়, আধিপত্য করুক মানুষ। এটা কি খুব বেশি চাওয়া ছিল আমাদের? সে চাওয়া থেকেও যোজন-যোজন দূরে আমরা। আশায় বুক বাঁধতে বাঁধতে বুক পাথর হয়ে গেছে। গানের কথায়– ‘আশায় আশায় দিন যে গেল, আশা পূরণ হলো না’।

আশার দোলাচলেই বেঁচে থাকি আমরা। আশার দোলাচলেই এ শহর প্রতিদিন ঘুম থেকে ওঠে। দিন পেরিয়ে যাচ্ছে, পেরিয়ে যাচ্ছে রাত; তবু আশা ফুরোচ্ছে না। নতুন সূর্য উঠছে, নতুন আশার কেতনও উড়ছে। আমরা আশা হারাচ্ছি না।

পাওয়া-না পাওয়ার হিসেব মিলুক আর নাই মিলুক, আমরা হাল ছাড়তে নারাজ। বাঙালি হয়ে যেহেতু জন্মেছি, আশা আমরা করেই যাব। তাই নতুন বছরেও প্রত্যাশার ডালপালা মেলে বসেছি। এবারও আশা করছি, আগামিতে ভালো কিছু অপেক্ষা করছে। নিশ্চয়ই করছে।


সম্পর্কিত আরও পড়ুন




Leave a reply